ফেব্রুয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। খবর নিক্কেই এশিয়া।
অন্যদিকে গত ছয় মাসে এআইকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে নতুন উত্থান দেখা গেছে। ফলে বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার, পণ্য ও বন্ডবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে।
বৈশ্বিক আর্থিক খাতে চলতি বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে আলোচিত দুটি শব্দ ছিল ‘ইরান’ ও ‘এআই’। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঝুঁকি বাড়ে বিশ্ববাজারে। শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, এশিয়ার মুদ্রাগুলোর ওপর চাপ পড়ে এবং সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও মুনাফার পূর্বাভাস বাড়াতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে এশিয়ার প্রযুক্তি সরবরাহ চেইনের কোম্পানিগুলোর ওপর। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপানের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ প্রবণতা থেকে বড় সুবিধা পায়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও এশিয়ায় প্রযুক্তি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর প্রধান কারণ ছিল এআইয়ের উত্থান। এ সময় মেমোরি চিপ, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি যন্ত্রাংশ নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর দ্রুত বেড়ে যায়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের বাজারমূল্য গত ছয় মাসে দ্রুত বেড়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাতারে উঠে আসে। একপর্যায়ে কোম্পানিটির বাজারমূল্য স্যামসাং ইলেকট্রনিকসকেও ছাড়িয়ে যায়। একইভাবে জাপানের কিওক্সিয়া হোল্ডিংসের বাজারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে দেখা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি, তাইওয়ানের তাইএক্স ও জাপানের নিক্কেই সূচক একাধিকবার নতুন রেকর্ড গড়েছে বছরে প্রথমার্ধে। তবে দ্রুত উত্থানের কারণে বাজারে অস্থিরতাও বেড়েছে। বিশেষ করে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বাড়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে কিছুটা হতাশাও দেখা গেছে। চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে চলতি বছর সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারবাজার। দেশটির প্রধান সূচক ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। এমএসসিআই ইন্দোনেশিয়ার বাজারকে নিম্নতর শ্রেণীতে নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলার পর থেকেই বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমার পরিবর্তে বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও ডলারকে শক্তিশালী করেছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ওন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
জাপানের ইয়েনও ১৯৮৬ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে পৌঁছেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মুদ্রাও চাপের মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহ, থাইল্যান্ডের বাত ও ফিলিপাইনের পেসো ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে।
পণ্যবাজারে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা দেখা গেছে জ্বালানি খাতে। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার। পরে তা বেড়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। একই সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২৬ ডলারের বেশি উঠে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক শান্তি চুক্তির পর তেলের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। বর্তমানে দুই ধরনের তেলের দামই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে স্বর্ণের দাম ট্রয় আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তবে পরে দাম কমতে থাকে। গত সপ্তাহে মূল্যবান ধাতুটির দাম ৪ হাজার ডলারের নিচেও নেমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা, ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিনিয়োগ তহবিল থেকে অর্থ প্রত্যাহারের কারণে স্বর্ণের দাম কমেছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন দেশের আর্থিক ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের ফলে সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধেও বৈশ্বিক বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এআই খাতের বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।